বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:৩৪ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, ইউনিভার্সেল নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম : বরিশালের উজিরপুর উপজেলার শিকারপুরবন্দরে এক এতিম পরিবারের সম্পত্তি দখল সন্ত্রাসের মাধ্যমে লুটেপুটে নিতে জোরেশোরে মরিয়া হয়ে উঠছে বন্দরের সেই বহুল বিতর্কিত নানা অন্যায় অপকর্মের হোতা মুখোশ পরিহিত ভদ্রলোক হেমায়েত মুন্সি ও তার অন্ধকার জগতের সাঙ্গপাঙ্গরা। এতিম পরিবারের পুরো সম্পত্তি জবর দখলে তিনি নানাবিধ কায়দায় ষড়যন্ত্রের ছঁক কষে চলছে। এতিম পরিবারের বাড়ি-ঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলে নিতে গভীর ষড়যন্ত্রের কলকাঠি নাড়ছে চক্রটি। ইতোমধ্যে এতিম পরিবারের দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি ধরে চলা একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দখলে নিতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে হেমায়েত মুন্সি ও তার সহযোগিরা।
সম্প্রতি প্রয়াত ব্যবসায়ী এসএম হিরণ (মিজানুর রহমান) এর ভগ্নিপতি হন এই হেমায়েত মুন্সি। মিজান দীর্ঘ ৩০-৩৫ বছর পর্যন্ত শিকারপুর বন্দরের সিএন্ডবির সম্পত্তিতে নিজের অর্থায়নে ভবন করে নিজের নামে ট্রেড লাইসেন্স করে ভ্যাট ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করে আসছিল। চলতি বছরের ২ জানুয়ারি (২০২৩) মিজান মারা যান। মারা যাওয়ার পর তার পরিবারটি পুরোপুরি এতিম হয়ে পড়েন। মিজানের সহধর্মিণী, তিন সন্তান নিয়ে এক ভয়াবহ সংকটময়মূহুর্ত চলছে। পরিবারে চলছে করুন আর্তনাদ! এরকম পরিস্থিতিতে এতিম পরিবারের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ওই দোকানসহ মিজানের সকল সম্পত্তি গলাধকরণে উঠেপড়ে লেগেছে মুখোশধারী ভদ্রলোক ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত হেমায়েত মুন্সি। যাইহোক- মিজান মারা যাওয়ার কয়েকদিন পর মিজানের সহধর্মিণী ও বড় ছেলে দোকান খুলেন। দু’দিন দোকান চালানোর পর সন্ত্রাসী কায়দায় হেমায়েত মুন্সির নির্দেশে সন্ত্রাসীরা দোকানে তিনটি তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।
হেমায়েত মুন্সির দাবি ওই দোকান মিজানের পিতার ছিল। এজন্য মিজানের ভাগ্নেরা অংশীদার হিসেবে দাবি করে দোকানে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এতিম পরিবার সহ বন্দরের বয়স্ক একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য, মিজানের পিতার দোকান যেখানে ছিল সেই দোকান নদীতে চলে গেছে। আর মিজানের পিতার কাঠের দোকান ছিল। অবশ্য মিজান অল্প বয়স থেকেই পিতার সঙ্গে থেকে আগের অর্থাৎ অন্যত্র যে পিতার কাঠের দোকান ছিল, সেখানে ব্যবসা করত। পিতার সেই কাঠের দোকান তৎকালীন সময়ে সিএন্ডবি ভেঙ্গে ফেলে এবং ওই কাঠের দোকানের স্থান নদীতে চলে যায়। এর কয়েক বছর পর মিজান অন্যত্র সিএন্ডবির সম্পত্তিতে দোকান গড়ে তোলে। সেখানে নিজে ভবন করে একাই দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে দোকান চালিয়ে আসছিল। অর্থাৎ প্রয়াত মিজানের বর্তমানে যেখানে দোকান নির্মাণ করেছে সেই দোকানে তার পিতা কখনোই বসেনি। মূলত: মিজান নিজ উদ্যাগে সেখানে দোকান গড়ে তোলে ট্রেড লাইসেন্স করে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে আসছিল। এখন মিজান মারা যাওয়ার পর পরিবারটি যখন এতিম হয়ে যায় সেই মুহুর্তে হেমায়েত মুন্সির নির্দেশে তার অপকর্মের সহযোগীরা ওই দোকান দখলে তালা ঝুলিয়ে দেয়। পাশাপাশি মিজানের আরো ৩/৪টি দোকান ভাড়া দেওয়া রয়েছে। সেই দোকানের ভাড়াটিয়াদের হেমায়েত মুন্সি হুমকি ধামকি দিচ্ছে। আর হেমায়েত ভাড়াটিয়াদের বলছে- এখন থেকে মিজানের ওইসব দোকানের ভাড়া টাকা আমার কাছে দিতে হবে। এরবাইরে এতিম পরিবারটিকে নিয়ে নানাধরণের কলকাঠি নেড়ে চলছে হেমায়েত মুন্সি।
বর্তমানে এতিম পরিবারটির সকল সম্পত্তি জবরদখলে হেমায়েত মুন্সি ও সাঙ্গপাঙ্গরা নানা ধরণের হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পুরোপুরি জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতার মাঝে বসবাস করছেন প্রয়াত মিজানের সহধর্মিণী ও তার সন্তানরা।
বলাবাহুল্য : উজিরপুরের শিকারপুর বন্দরের সকল দোকানই সিএন্ডবির সম্পত্তিতে গড়ে উঠেছে। এসব কারো ব্যক্তিগত-রেকডিও সম্পত্তি নয়।
শিকারপুরবন্দর বাজার কমিটির বর্তমান সভাপতি হেমায়েত মুন্সি। এই হেমায়েত মুন্সির বিরুদ্ধে রয়েছে এন্তার অভিযোগ। দখল সন্ত্রাস, ভূমি দস্যুতা সহ অন্ধকার জগতে হেঁটে চলে কালো অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছেন তিনি। কামিয়েছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। বনে গেছেন অগাধ বিত্ত বৈভবের মালিক। তার এতো অর্থ বিত্ত নিয়েও জনমনে রয়েছে নানা প্রশ্ন। তার বহু অপকর্ম ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় ধামাচাপা রয়েছে। বন্দরের অনেক মানুষ তার অপকর্মে নিরবে ক্ষোভ প্রকাশ করে চলছেন।
শিকারপুরবন্দরে ৮টি চান্দিনা ভিটি সন্ত্রাসের রামরাজত্ব কায়েমে দখলে নিয়েছিলেন হেমায়েত মুন্সি ও তার অপকর্মের সাঙ্গপাঙ্গরা। ২০১৯ সালে মহামান্য হাইকোর্টের আদেশবলে দীর্ঘদিনের ভোগ দখলীয় ওই সকল ভিটি দখল হওয়ায় তৎকালীন বরিশাল জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমানের নির্দেশে পূণরায় দখল বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা আক্তার। শিকারপুর বন্দরের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ও বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ আয়নাল হোসেন মৃধা ওই জমি দীর্ঘদিন ভোগ দখল করে আসছিলেন। তার মৃত্যুতে তার একমাত্র পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ মাহবুবুর রহমানও ওই জমি ভোগ দখল করেন। তারও মৃত্যুতে দ্ই পুত্র মাহফুজুর রহমান মাসুম ও মশিউর রহমান মামুনসহ ৮ জন দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে ভোগ দখল করে আসছেন। জরাজীর্ণ ভবনের সংস্কার কাজ শুরু করলে বাজার কমিটির সভাপতি ভূমিদস্যু চক্রের হোতা হেমায়েত মুন্সিসহ চক্রের অপর সদস্যরা ৪টি চান্দিনা ভিটি জোর পূর্বক দখল করে আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। এ কারণে মশিউর রহমান মামুন বাদী হয়ে মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনে ২০১৮ সনের ৪ নভেম্বর একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। মহামান্য হাইকোর্ট ২০১৮ সনের ১৫ নভেম্বর বরিশাল জেলা প্রশাসককে লীজকৃত জমি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। নির্দেশনানুযায়ী নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানা পুলিশের উপস্থতিতে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পরেই পূণরায় ওই জমিতে সাইনবোর্ড টানিয়ে চক্রটি পাকা ভবনের কাজ শুরু করে। এ কারণে পূণরায় বাদী পক্ষ হাইকোর্ট ডিভিশনের কাছে দ্বারস্থ হলে মহামান্য হাইকোর্ট ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারী পূণরায় দখল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য বরিশাল জেলা প্রশাসককে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে বাদী পক্ষের জমি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আদেশ প্রদান করেন। ওই আদেশে জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান, উজিরপুর নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুমা আক্তারকে থানা পুলিশের উপস্থিতিতে বাদীর ৮টি চান্দিনা ভিটি দখল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।
নানা অপকর্মের অনুঘটক চরম ধুরন্ধর প্রকৃতির হেমায়েত মুন্সির অন্ধকারজগত নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ধুমায়িত হচ্ছে। নানা জনে বলছে নানা কথা। জনশ্রুতি রয়েছে-হেমায়েত মুন্সির এক ভাই বেশ কয়েক বছর আগে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। সেই মামলার বাদী হেমায়েত মুন্সি। এক্ষেত্রে অসমর্থিত সূত্রগুলোর ভাষ্য, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে হেমায়েত মুন্সির হাত থাকতে পারে। আর এ কারণেই দীর্ঘ সময়েও আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন হয়নি। এতো বছর পরও মুখ থুবরে পড়ে আছে হত্যার রহস্য। এরফলে অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে হত্যা মামলাটি।
অনুসন্ধানী সূত্রগুলো বলছে, হত্যাকাণ্ড শিকারের আগে হেমায়েত মুন্সির সঙ্গে হত্যার শিকার ভাইয়ের বিভিন্ন সময়ে সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা, অর্থ লেনদেন সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রায় সময়ই বাকবিতণ্ডা হতো। এরইধারাবাহিকতায় হয়তবা তাকে চিরতরে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক অসমর্থিত সূত্রের ভাষ্য। আলোচিত এই হত্যা মামলাটি বর্তমানে পিবিআই তদন্ত করছেন।
হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে শিকারপুর বন্দর কমিটির সভাপতি হেমায়েত মুন্সি ইউনিভার্সেল নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এরআগে পুলিশ তদন্ত করেছে, কোন ক্লু পায়নি। এখন পিবিআই তদন্ত করছে। এরবাইরে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গে এড়িয়ে যান।
সকল অভিযোগ প্রসঙ্গে শিকারপুর বন্দর কমিটির সভাপতি হেমায়েত মুন্সি ইউনিভার্সেল নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ মিথ্যা-বানোয়াট-ভিত্তিহীন। কারো সম্পত্তির ওপর আমার কোন কুদৃষ্টি নেই। আমি কোন অন্যায় অপকর্মে সম্পৃক্ত নেই। এতিমের দোকান তালাবদ্ধ করার কথা শিকার করে তিনি বলেন, এই সম্পত্তি আমি জবর দখল করতে চাই না, তবে তাদের ভালোর জন্যই দোকান তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ওই দোকানের ওয়ারিশ রয়েছে তারাই তালা দিয়েছে। সিএন্ডবির সম্পত্তির দোকানের ট্রেড লাইসেন্স মিজানের নামে ভ্যাট-ট্যাক্স মিজান দিয়ে আসছে স্বত্তাধিকারী মিজান, সেখানে আবার কিসের ওয়ারিশ এমন প্রশ্নে বলেন, ওটা একসময়ে অনেক বছর আগে মিজানের পিতার দোকান ছিল এজন্য মিজানের ভাগ্নেরা ওয়ারিশ দাবি করে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।
এসব বিষয়ে প্রয়াত মিজানের স্ত্রী ও তার সন্তানরা এই ভয়ঙ্কর চক্রের হাত থেকে রক্ষা পেতে বরিশাল জেলা প্রশাসক, উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনী শীর্ষ পর্যায়ের আশু দৃষ্টি কামনা করেছেন।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply